রাজশাহী প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মা চরের ত্রাসের রাজত্ব কায়েমকারী কাকন বাহিনীর মাঠের নেতৃত্বে পরিবর্তনের কথা শোনা যাচ্ছে।
কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষ পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। পরিচালনা করেন বিশেষ অভিযান অপারেশন ফার্ষ্টলাইট। তারপর থেকে আরও বেশি আত্মগোপনে চলে গেছে ইঞ্জিনিয়ার কাকন। গুঞ্জন আছে কাকন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি চর উদয়নগরের দুর্গমচরে অবস্থান করছে। এটি ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্যই দুর্গম ও যাতায়াতের কোন রাস্তা না থাকায় এই জায়গাই আশ্রয়ের জন্য বেছে নিয়েছেন কাকন।
পদ্মার চরাঞ্চলগুলো দুর্গম হওয়ায় চরগুলো সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, কাকন বাহিনী, মন্ডল বাহিনী, বেলাল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, বান্নাহ বাহিনী, সুখচাঁদ বাহিনী, কালু বাহিনী, নাহারুল বাহিনী অন্যতম সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী।
এসকল সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে কাকন বাহিনী সব থেকে শক্তিশালী। আধিপত্য বিস্তার, বালুমহল নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে। পদ্মার চরের বালু থেকে শুরু করে সবকিছুতেই কাকন বাহিনীর হিস্যা থাকতে হবে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় কাকন বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ মামলা করতে সাহস পায়নি। সম্প্রতি কিছু ঘটনায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। এরপর থেকেই একের পর এক হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে বিস্তির্ণ পদ্মার চরাঞ্চলে।
গত বছর ২৭ অক্টোবর দৌলতপুরের পদ্মা নদীর দুর্গম চরে এই বাহিনীর গুলিতে দুই কৃষক নিহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। নিহত দুজন মণ্ডল গ্রুপের আমান মণ্ডল (৩৬) ও নাজমুল মণ্ডল (২৬) বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটি বলছে, একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে কাকন বাহিনীর সদস্য লিটনও (৩০) নিহত হয়েছেন।
চার জেলাজুড়ে বিস্তৃত পদ্মার দুর্গম এই চরাঞ্চলে প্রায় ২০ বছর আগেও দুটি সন্ত্রাসী বাহিনীর উত্থান ঘটেছিল। তাদের ভাগ না দিয়ে কেউ চরের ফসল ঘরে তুলতে পারতেন না। এ নিয়ে দ্বন্দ্বে তাদের হাতে ওই সময় ৪১ জন মানুষ খুন হন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তখন চরের মাটিতে পা দিতে গা ছমছম করত। দুই বাহিনীর নাম ছিল ‘পান্না বাহিনী’ ও ‘লালচাঁন বাহিনী’। পান্নার ওস্তাদ ছিলেন এই কাকন।
আবার ঠিক তেমনি একের পর এক হত্যকান্ড শুরু হয়েছে।
সর্বশেষ ৯ জুন কাকন বাহিনী ও বেলাল বাহিনীর সংঘর্ষে কাকন বাহিনীর আজিজুল হক ঝড়ু ওরফে ঝড়ু মস্তান নিহত হন।
বিশ বছর আগে ২০০৫ সালে র্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে নিতত হন পান্না। ২০০৫ সালে পান্না নিহত হওয়ার পর ২০০৭ সালে কাকন সৌদি আরবে চলে যান। কয়েক বছর পর ফিরে এসে আওয়ামী লীগের নেতাদের আশ্রয়ে এলাকার বালুমহালগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। এই বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই তিনি গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী।
আর সেই বাহিনী ও অপরাপর বাহিনীগুলোর মধ্যে পরস্পর সংঘর্ষ ও দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টিভিতে কাকনের ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় তার জন্য চলাচল বা সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। আর সেকারনেই তার অবর্তমানে তার দায়িত্ব পালন করার জন্য ঈশ্বরদী পৌর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমতিয়াজ চৌধুরী মিলন ওরফে মিলন চৌধুরীকে এবং ঝড়ু মস্তানের স্থলে আবু বক্কারকে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
অপারেশন ফার্স্টলাইটের পর সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো কিছুদিন শান্ত থাকলেও আবারও শুরু হয়েছে তাদের তান্ডব। একেরপর এক গোলাগুল ও হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। ফলে আতংকে দিন কাটছে চার জেলার নদী পারের বাসিন্দাদের।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দূর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় তাদের সহজে গ্রেফতার করা যায় না। পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে তারা দুর্গম চরের আরও গভীরে প্রবেশ করে ফলে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
বাহিনীটির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন,মিলন চৌধুরী ও বক্কার বাহিনী বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।
