রাজশাহী ব্যুরোঃ বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ‘বিতর্কিত’ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের এমডি পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তরাঞ্চল বিটিসিএল-এ আবারও চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অবসরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি আরেক ‘বিতর্কিত’ ও ‘দুর্নীতিবাজ’ জিএম (গ্রাহকসেবা) আব্দুল মালেককে উত্তরাঞ্চলের সিজিএম পদে পদায়ন করেছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অন্যায়ভবে বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোরও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত সরকারের সময় ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহীতে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সিজিএম আব্দুল মান্নান ও জিএম আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অফিস পরিচালনা, নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিতি, ব্যক্তিগত আক্রোশে বদলি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে উত্তরাঞ্চল বিটিসিএলে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়েছিল। এসব অনিয়মের প্রতিবাদে উত্তরাঞ্চলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একপর্যায়ে কর্মবিরতিতে গেলে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর রাজশাহী পরিদর্শন করেন। পরে ৩ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিজিএম আব্দুল মান্নান ও জিএম আব্দুল মালেককে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। এতে কিছুদিন স্বস্তি ফিরে এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি আবারও পাল্টে যায়। জিএম আব্দুল মালেককে অতিরিক্ত সিজিএমের দায়িত্ব দিয়ে উত্তরাঞ্চলের অনেক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়। কিছুদিন পর আব্দুল মান্নান বিটিসিএলের ডিএমডি পদে দায়িত্ব পান। বদলিকৃত কর্মস্থলে থাকা সত্ত্বেও আব্দুল মান্নান রাজশাহীতে নিজের ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য বিটিসিএলের গাড়িসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে আসছেন। এমনকি এই কর্মকর্তার স্ত্রী অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও নিয়মিত রাজশাহী বিটিসিএল-এর গাড়ি ব্যবহার করেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
জানা গেছে, নবগঠিত মন্ত্রিসভার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আব্দুল মান্নানকে প্রায় এক মাসের জন্য বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব
দেয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, তাঁর পিআরএল ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল গত ৩ মার্চ। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে এমডির দায়িত্বে থেকে তিনি নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন। সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে নিজের প্রভাব খাটিয়ে আব্দুল মালেককে অতিরিক্ত দায়িত্ব সিজিএম, উত্তরাঞ্চল এবং জিএম-২, রংপুর হিসেবে আদেশ জারি করেছেন। জিএম আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রেষণাদেশ বাতিল না করে দীর্ঘদিন ধরে তাকে রাজশাহীতেই গ্রাহকসেবার জিএম পদে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে এ বিভাগের তেমন কার্যক্রম না থাকায় এটি কার্যত একটি নিষ্ক্রিয় পদে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকেও এবং কোনো কাজকর্ম না করেও বিভিন্ন খাতে সরকারি অর্থ উত্তোলন করেন।
অন্যদিকে আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে সরকারি বাসায় থেকেও বাসার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, রাজশাহীর শ্রীরামপুরে বিটিসিএলের ডিই বাংলোতে ২০১৭ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাসা বরাদ্দ নিয়ে বসবাস করলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করে দপ্তর থেকে পরিশোধ করার প্রমাণ মিলেছে।
বিগত সরকারের সময় বিটিসিএল কর্মচারী রফিকুল ইসলাম জুয়েলকে (মহানগর শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি) ব্যবহার করে স্ক্র্যাপ মালামাল চুরিসহ বিভিন্ন ঘটনার ইন্ধনও তিনি দিয়েছেন বলে সূত্র জানায়। সরকার পতনের পরও জুয়েল মান্নান-মালেক সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় থাকায় কখনো অন্যত্র বদলি হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপসচিব (সচিবের একান্ত সচিব) বি. এম. মশিউর রহমানকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তায় তিনি এবিষয়ে বিটিসিএল এমডির সঙ্গে কথা বলতে বলেন। ৪র্থ গ্রেড ও এর উপরে পদায়ন মিনিস্ট্রি থেকে থেকে হওয়ার নিয়ম থাকলেও এমডি কীভাবে সিজিএম পদে পদায়ন করলেন এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে মিটিংয়ে আছেন বলে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠান।
এবিষয়ে জানতে বিটিসিএল-এর এমডি আব্দুল মান্নানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এবিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
