নিজস্ব প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে গরু চুরির সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে আটক করে মধ্যযুগীও কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতনের ঘটনায় শিমুল (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় শমজান (৪০) নামে অপর একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে ঘটনাটিকে ঘিরে এখন দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন! স্থানীয়দের একাংশের দাবি, গরু চুরির সন্দেহে তাকে আটক করা হলেও ঘটনাস্থলে চুরির কোনো সরঞ্জাম বা চুরি যাওয়া গরু উদ্ধারের বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে নিহত শিমুলের পরিবারের অভিযোগ তাকে পরিকল্পিতভাবে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গিয়ে চোর সাজিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) ভোরে জোতকাদিরপুর স্কুল থেকে দক্ষিণ পশ্চিম কর্নারে জিয়ারুলের ঘরের বারান্দার সিমেন্টের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়। এতে জোতকাদিরপুর গ্রামের মোস্তফার ছেলে শিমুল নিহত হন। আহত হন একই গ্রামের নবীন শাহের ছেলে শমজান।
শিমুলের মা বলেন, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তার ছেলে বাড়িতে এসে খাবার খেয়ে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর আনুমানিক ৩টার দিকে একজন ফোন করে শিমুল বাড়িতে আছেন কি না জানতে চান। এরপর পরিবারের সদস্যরা খোঁজ নিয়ে দেখেন, শিমুল ঘরে নেই এবং তার ঘরের জানালা ভাঙা। আমার ছেলেকে জানালা ভেঙে বের করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে গত ৮-৯ মাস আগে আমার ছেলের সাথে শুকটা, আনিসুর, রানা ও মারুফের বাকবিতন্ডা হয়। পরে তারা বাড়িতে এসে আমার ছেলে কে না পেয়ে আমার স্বামীকে মারধোর করে ঘরের জানালা দরজা ভাংচুর করেন। সেইদিন তারা আমার ছেলে কে পেলে মেরে ফেলতো। তারা আমার ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকিও দিতো।
শিমুলের স্ত্রী বলেন, শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি রাতে বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলেন। ফলে কখন তার স্বামী ঘর থেকে বের হয়েছেন কিংবা কে তাকে নিয়ে গেছে, তা তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি বলেন, দেশে আইন আছে, পুলিশ আছে। আমার স্বামী সত্যিই চুরি করে থাকলে তাকে চুরি যাওয়া মালামালসহ হাতেনাতে আটক করা যেত। আমাদের খবর দেওয়া যেত। কিন্তু তাকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।
তিনি অভিযোগ করেন, শিমুলকে বেঁধে মারধর করা হয়েছে এবং তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে। এমনকি তার দুই হাতে পেরেকজাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করার অভিযোগও করেন তিনি।
নিহত শিমুলের প্রতিবেশি চাচা মজিবুর বলেন, শিমুল একটু নেশা করে। তার বিরুদ্ধে আগে তেমন চুরির কোন অভিযোগ পাওয়া যায় নি। চুরির বিষয়ে কোন শালিশও হয়নি, আবার থানায় চুরির মামলাও হয়নি কখনো। তবে তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা রয়েছে। ঘটনা যেটাই হোক এই ভাবে একজন কে মেরে ফেলা মোটেও কাম্য নয়।
এ ঘটনায় বাঘা থানায় পৃথক দুটি মামলা রুজু করা হয়েছে। একটি চুরি অন্যটি হত্যা মামলা। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইয়ারুলকে পুলিশ থানায় নিয়ে আসলেও তার কাছ থেকে চুরির মামলা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
রাতে একটি বাড়িতে গরু চুরির চেষ্টা হয়েছে এমন অভিযোগে শিমুলকে মারধোরের পরে তার শিকারোক্তিতে শমজানকে আটক করেন স্থানীয় কয়েকজন। মারধর করার পরে ব্যাটারীচালিত অটোভ্যান যোগে পরে তাদের বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালটির জরুরী বিভাগের চিকিৎসক শিমুল কে মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ নিহত শিমুলের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠান। ময়নাতদন্ত শেষে শিমুলের মৃতদেহ দাফন করা হয়।
অপরদিকে রামেক হাসপাতালে গুরুতর আহত শমজান কে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে চুরি মায়লায় তাকে আটক দেখিয়ে মঙ্গলবার বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে শিমুলকে বেঁধে মারধর করতে দেখা যায়। ছড়িয়ে পড়া এ ভিডিওটির দৃশ্য নিয়ে জনমনে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, কেন তাকে এভাবে বেঁধে মারধর করা হলো, কারা তাকে আটক করেছিল, কার নির্দেশে বা কী অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল এবং মারধরের সময় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন?
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। যে বাড়িতে গরু চুরির অভিযোগ করা হয়েছে, সেখানে শিমুলকে মারধর করা হয়নি বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ভিডিও টি ভইরাল হয়েছে তা থেকে দেখা যায় পাশের একটি বাড়ির বারান্দার সিমেন্টের খুঁটির সঙ্গে তাকে বেঁধে মারধর করা হয়। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, যদি ওই বাড়িতেই চুরি করতে গিয়ে শিমুল ও শমজানকে আটক করা হয়ে থাকে, তাহলে তাদের অন্য বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কেন মারধর করা হলো?
এখন প্রশ্ন হলো কেন ঘটনাস্থল পরিবর্তন করা হলো? সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন? কে বা কারা তাদের অন্য বাড়িতে নিয়ে গেলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে। তবে শিমুলকে মারধরের মুহুর্তে এলাকার জন প্রতিনিধি মেম্বর লিটন বিভিন্ন মাধ্যমে খবর শুনে উপস্থিত হন বলে জানিয়েছেন অনেকেই।
লিটন বলেন, আমি লোক মারফত শুনে ঘটনা স্থলে গিয়ে দেখি শিমুলকে বেঁধে মারধর করছেন। আমি তাদের নিষেধ করি এবং যোতকাদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে আসা হয়। পরে শমজান কে দেখতে পেয়ে উপস্থিত লোকজন তাকেও মারধর করে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ঘটনাস্থলে তারা চুরি করার কোনো সরঞ্জাম দেখতে পাননি। শিমুলের কাছ থেকেও চুরি করার কাজে ব্যবহৃত কোনো সরঞ্জাম বা চুরি যাওয়া গরু উদ্ধারের বিষয়টি তারা জানেন না। এ কারণে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে শিমুল কি সত্যিই গরু চুরি করতে গিয়েছিলেন, নাকি কোনো পূর্ববিরোধের জেরে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে?
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, শিমুল কে মারধোর করলে তিনি কয়েকজনের নাম বলেন, তার মধ্যে শমজানের নাম রয়েছে। শমজান লোকমুখে চোর ধরা পড়েছে শুনে দেখতে গেলে তার ওপর ও হামলা চালানো হয়। কিন্তু শমজান প্রথম থেকে সেখানে না থাকলেও শিমুলের মুখের জবানবন্দিতে তার নাম থাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান,
শিমুল মৃত্যু আগে এমন আরো ৮ থেকে ৯ জনের নাম বলে গেছেন।
তবে এ বিষয়ে চুরির অভিযোগকারী ইয়ারুলের বাড়িতে কেউ না থাকায় তাদের কোন বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে শিমুলের বাবা অভিযোগ করে বলেন, তিনি অভিযোগের কপিতে ৮ জনের নাম উল্লেখ করলেও এজাহারে সকল অভিযুক্তের নাম অজ্ঞাত নামা দেখানো হয়েছে। তিনি তার সন্তান হত্যার বিচার দাবি করেছেন।
বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ সেরাজুল হক জানান, এই ঘটনাটি খুবই দুঃখ জনক। এমন ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। এই বিষয় দু'পক্ষই অভিযোগ দায়ের করেছেন। তবে হত্যা মামলায় কোন নাম উল্লেখ করা হয় নি। কেউ আসামির নামের কথা বলেনি। এ বিষয়য়ে পৃথক দুটি মামলা রুজু করা হয়েছে। আসামি আটকের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় আর কেউ যেনো আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়।
স্থানীয়রা বলছেন তদন্তেই মিলবে আসল রহস্য, তবে এ ঘটনায় সামনে আসা নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলমান রয়েছে আমাদের অনুসন্ধান। অনুসন্ধান শেষে আসছে পরবর্তী পর্ব-------- এ ঘটনায় কোন নির্দোষ মানুষকে যেন ফাঁসানো না হয় এ দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার দাবি এলাকাবাসীর।
