নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাঁদের স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের নাম থাকার অভিযোগ উঠেছে। ৬৯ জনের নিয়োগের তালিকা বিশ্লেষণ ও স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। তালিকায় একজন জামায়াতকর্মীর নামও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সংবাদ পড়ুন
গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সারবিষয়ক কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি রাজশাহী জেলার ৬৯ জন নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠায়। এর আগে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে বাগমারার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ডিলার নিয়োগ এখনো আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ডিলার নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে জেলা প্রশাসক, কৃষি বিভাগের উপপরিচালক ও জেলার তিনজন সংসদ সদস্যসহ পাঁচজন উপস্থিত ছিলেন বলে প্রশাসনের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে তালিকায় একজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এক নম্বরে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আবেদনকারীদের কেউ কেউ লটারির মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের দাবি জানালেও রাজনৈতিক চাপের কারণে তা করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন এবং নিয়োগ পাওয়া অনেকেরই সার ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়।
চারঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নে আলিফ ট্রেডার্সের জিনিয়া পারভিনের নাম রয়েছে। তিনি উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সরদহ ইউনিয়নে অথৈয় অ্যান্ড আরিয়া ট্রেডার্সের ইসরাত জাহান উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী। নিমপাড়া ইউনিয়নে দুর্জয় ট্রেডার্সের মালিক ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। ইউসুফপুর ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে নাম এসেছে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখার।
বাঘা উপজেলার মনিগ্রামে রুবেল ট্রেডার্সের মালিক রুবেল আলী জেলা বিপ্লবী দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকুড়িয়া ইউনিয়নে জিয়া এন্টারপ্রাইজের জিয়ারুল ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সদস্য। বাউসা ইউনিয়নে আতিক ট্রেডার্সের জোবাইদা খাতুন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন পলাশের স্ত্রী। গড়গড়ি ইউনিয়নে রুহি এন্টারপ্রাইজের আব্দুল মমিন ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক।
এ ছাড়া আড়ানী পৌরসভায় মেসার্স আসাদুজ্জামানের মালিককে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এবং বাঘা পৌরসভায় সাদি এন্টারপ্রাইজের মালিক শফিকুল ইসলামকে উপজেলা জিয়া পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তানোর পৌরসভায় মেসার্স মণ্ডল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন পৌর যুবদলের আহ্বায়ক এমদাদুল হক মণ্ডল। মুন্ডুমালা পৌরসভায় মেসার্স বন্ধন এন্টারপ্রাইজের মালিক ফরহাদ কবির পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কবিরের ভাই। কলমা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া তানভীর আহমেদ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত শীষ মোহাম্মদের ছেলে।
পাঁচন্দর ইউনিয়নে মেসার্স অহনা ট্রেডার্সের মালিক উম্মুল মোমেনিন খান উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম মোর্তুজার স্ত্রী। সরনজাই ইউনিয়নে মেসার্স শাহনেওয়াজ ট্রেডার্সের মালিক শাহনেওয়াজ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে। চাঁন্দুড়িয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাজী ট্রেডার্সের মালিক আলাউদ্দিন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাধাইড় ইউনিয়নে মেসার্স মর্জিনা এন্টারপ্রাইজের সিদ্দিকা তামান্না উপজেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মামুনুর রশিদের স্ত্রী। কামারগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স রাদিয়া এগ্রোর মালিক শরিফ উদ্দিন উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব। তালন্দ ইউনিয়নে মেসার্স বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক ওমর ফারুক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল হান্নানের ছেলে।
পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর ইউনিয়নে মেসার্স আহসান ট্রেডার্সের মালিক আহসান হাবীব ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। শিলমাড়িয়া ইউনিয়নে মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক খাদেমুল ইসলাম উপজেলা বিএনপির সদস্য।
পুঠিয়া সদরে মেসার্স হিমেল ট্রেডার্সের মালিক রিসাব হোসেন কেতাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। জিউপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স সাঈদ ট্রেডার্সের মাহাবুর রহমান ইউনিয়ন কৃষকদলের সদস্য সচিব। বানেশ্বর ইউনিয়নে মেসার্স সরকার এন্টারপ্রাইজের মালিক জাকির হোসেন রাসেল স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব। পুঠিয়া পৌরসভায় মেসার্স ফারিশ ট্রেডার্সের মালিক সাহেদ হাসান রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের নাতজামাই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোহনপুর উপজেলার ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নে শাপলা ট্রেডার্সের মালিক উমর ফারুক বিএনপি নেতা আব্দুল মালেকের ছেলে। পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে মেসার্স ইপ্তি এন্টারপ্রাইজের মালিক নাঈম ওয়াসিফ উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। হরিয়ান ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে নাম আসা আতিকুর রহমান উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেনের ছেলে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নে মেসার্স বিদ্যুৎ এন্টারপ্রাইজের মালিক বেদার উদ্দিন বিদ্যুৎ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক। গোদাগাড়ী পৌরসভায় দুই ভাই ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল্লাহ জামায়াতের কর্মী বলে স্থানীয়দের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। বাসুদেবপুরে নিয়োগ পাওয়া মাইনুল উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলমের ভাই।
এ ছাড়া কাকনহাট পৌরসভায় নিয়োগ পাওয়া হাবিবুর রহমান পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। গোদাগাড়ী ইউনিয়নে যুবদলের আহ্বায়ক শামীম রেজা এবং রিশিকুল ইউনিয়নে ছাত্রদলের সভাপতি হোসেন আল মামুন ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্গাপুর উপজেলার ঝালুকা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া ওয়ালিউজ্জামান রওনক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান আয়নালের ছেলে। দুর্গাপুর পৌরসভায় নিয়োগ পাওয়া শাহ আলম সবুজ জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক মেয়র সাইদুর মন্টুর ছেলে। জয়নগর ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া সাইদুর রহমান উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জুবায়েদ হোসেনের ভাই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলীয়ভাবে সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ তালিকা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, তাঁরা কোনো তালিকা দেননি; প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছে।
অন্যদিকে, তালিকা নিয়ে বিরোধের কারণে বাগমারা উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার সার ডিলার নিয়োগ আটকে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল বারী সুপারিশ করা দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে কৃষি সচিব ও অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য।
সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম এবং কমিটির সদস্যসচিব ও কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।
